টাকার অভাবে মাথার চুল বিক্রি করে সন্তানের মুখে ভাত ও ঘরভাড়া
- আপডেট সময় : ০৬:৫৪:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬ ১১৩ বার পড়া হয়েছে

মোঃ নাসির উদ্দিন, বিষেশ প্রতিনিধিঃ পটুয়াখালী
বাগেরহাটের এক সন্তানের জননী রেহানা বেগমের মানবেতর জীবনসংগ্রাম
বাগেরহাটের এক অজপাড়াগাঁয়ের ছোট্ট একটি ঘর। ঘর বললেও যেন ঠিক ঘর বলা যায় না টিনের চাল, পুরোনো বেড়া আর নানা অভাব-অনটনের চিহ্নে ভরা একটি আশ্রয়। সেই ঘরেই সন্তানকে বুকে আগলে দিনের পর দিন বেঁচে আছেন রেহানা বেগম।
রেহানা একজন মা। আর একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সন্তান। নিজের পেটে খাবার না থাকলেও সন্তানের মুখে একমুঠো ভাত তুলে দিতে পারলেই যেন তার বুকটা শান্ত হয়ে যায়।
কিন্তু অভাব যে বড় নির্মম!
কখনো ঘরে চাল থাকে না, কখনো ঘরভাড়া দেওয়ার টাকা থাকে না। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটে রেহানার। চোখের পানি মুছে নিজেকেই প্রশ্ন করেন,
“আগামীকাল আমার সন্তানকে কী খাওয়াব?
একদিন সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না তিনি।
ঘরে টাকা নেই। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে হবে। ঘরভাড়াও বাকি। পরিচিতজনদের কাছে হাত পেতেও যেন লজ্জা আর অসহায়ত্বের দেয়াল সামনে এসে দাঁড়ায়।
শেষ পর্যন্ত নিজের শরীরের একটি অংশকেই সম্বল করলেন রেহানা—মাথার চুল।
যে চুল একজন নারীর সৌন্দর্যের প্রতীক, যে চুল যত্ন করে আঁচড়ানোর কথা, সেই চুলই অভাবের কাছে বিক্রি করে দিতে হলো তাকে।
চুল বিক্রি করে পাওয়া সামান্য কিছু টাকা হাতে নিয়ে রেহানা হয়তো সেদিন বড় কোনো স্বপ্ন দেখেননি। তার স্বপ্ন ছিল খুব ছোট, সন্তানের মুখে একটু ভাত তুলে দেওয়া, আর মাথা গোঁজার ঘরটির ভাড়া পরিশোধ করা।
বাজার থেকে সামান্য চাল-ডাল নিয়ে যখন তিনি ঘরে ফিরলেন, সন্তানদের চোখে হয়তো আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠেছিল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে একজন মায়ের বুকের ভেতর তখন চলছিল নিঃশব্দ কান্না।
সন্তানরা হয়তো জানে না, তাদের একবেলার খাবারের পেছনে মায়ের কতটা আত্মত্যাগ লুকিয়ে আছে।
তারা জানে না
তাদের মুখে ভাত তুলে দিতে গিয়ে মা তার নিজের সৌন্দর্য বিক্রি করেছেন।
তারা জানে না
তাদের মাথার ওপর একটি ছাদ ধরে রাখতে মা কতটা অসহায় হয়ে পড়েছেন।
আর রেহানা,
তিনি শুধু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
ওরা ভালো থাকলেই আমি ভালো আছি।
এটাই হয়তো একজন মায়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
নিজের ক্ষুধা, নিজের কষ্ট, নিজের অপমান, সবকিছু ভুলে সন্তানকে ভালো রাখার চেষ্টা করেন তিনি। অথচ সমাজের চোখে হয়তো তিনি শুধুই একজন দরিদ্র নারী। কিন্তু একজন মায়ের কাছে তার সন্তানই পুরো পৃথিবী।
রেহানার জীবন যেন আমাদের সমাজের সামনে একটি নির্মম প্রশ্ন ছুড়ে দেয়
একজন মা যখন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে নিজের চুল পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন আমাদের মানবিকতা কোথায়,
দারিদ্র্য কোনো অপরাধ নয়। অভাব কোনো লজ্জা নয়। লজ্জা তখনই, যখন আমাদের আশপাশে কেউ না খেয়ে থাকে, অথচ আমরা তার কান্না শুনেও শুনি না।
রেহানা বেগমের গল্প শুধু একজন অসহায় নারীর গল্প নয়। এটি একজন মায়ের গল্প যে মা নিজের সবটুকু দিয়ে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে চান।
হয়তো তার ঘরে দামি আসবাব নেই, নেই নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কিন্তু তার হৃদয়ে আছে সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
আজ প্রয়োজন রেহানার মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। প্রয়োজন সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া। প্রয়োজন এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো মাকে সন্তানের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার জন্য নিজের চুল বিক্রি করতে না হয়।
কারণ
একজন মায়ের চোখের পানি কখনো শুধু পানি নয়; সেখানে লুকিয়ে থাকে সন্তানের জন্য হাজারো স্বপ্ন, অসহায়ত্ব আর বেঁচে থাকার আকুতি।
রেহানা বেগম হয়তো আজও অভাবের সঙ্গে লড়ছেন। কিন্তু তার বুকের ভেতর একটি আশার আলো এখনো জ্বলছে
“আমার সন্তানরা একদিন ভালো থাকবে, আর সেই দিন হয়তো আমার এই কষ্টগুলোরও মূল্য থাকবে।
এই আশাতেই একজন মা প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকেন।

















