টাকি মাছ, মানুষের লোভ ও চিলের থাবা একটি উপন্যাসধর্মী শিক্ষামূলক গল্প
- আপডেট সময় : ১১:৩৩:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ ১৭৫ বার পড়া হয়েছে

লেখক: মোঃ নাসির উদ্দিন, গলাচিপা, পটুয়াখালী।
বর্ষার শেষভাগ। চারদিকে অথৈ পানি। বিল, খাল আর নদী যেন একাকার হয়ে গেছে। সেই বিশাল বিলে বাস করত এক জোড়া টাকি মাছ।
তাদের ছোট্ট সংসার ছিল ভালোবাসা, স্বপ্ন আর নির্ভরতায় ভরা। বর্ষার পানির স্রোতে একদিন তারা ভেসে এলো একটি সবুজ ধানক্ষেতে। চারদিকে প্রচুর খাবার, স্বচ্ছ পানি আর নিরাপদ আশ্রয়। মনে হলো, এ যেন নতুন জীবনের শুরু।
দিনগুলো আনন্দেই কাটছিল।
কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না। ধীরে ধীরে বর্ষার পানি নামতে শুরু করল। একসময় চারপাশ শুকিয়ে এলো। যে জমিতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল, সেটি পরিণত হলো মৃত্যুফাঁদে। সামান্য কাদাজল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।
স্ত্রী মাছটি আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
আমাদের কি হবে? পানি শুকিয়ে গেলে তো আমরা বাঁচব না!”
স্বামী মাছটি শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হয়ো না।
তিনি আমাদের জন্ম দিয়েছেন, তিনিই আমাদের মৃত্যু ও জীবনের পথ নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমরা শুধু তাঁর ওপর ভরসা রাখি।”
এমন সময় এক রাখাল গরুর জন্য ঘাস কাটতে এসে মাছ দুটিকে দেখতে পেল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে মাছ দুটি ধরে বাড়িতে নিয়ে গেল।
“মা, দেখো! আজ কত বড় দুইটা টাকি মাছ ধরেছি। রান্না করো, আজ ভালো করে ভাত খাব।”
রাখালের মা উঠানে বটি নিয়ে বসে মাছ কাটার প্রস্তুতি নিলেন।
স্ত্রী মাছটির চোখে তখন মৃত্যুর ছায়া।
এবার তো সত্যিই শেষ। আমাদের শরীর টুকরো টুকরো করে ফেলবে!”
স্বামী মাছটি আবারও ধৈর্যের সঙ্গে বলল,
যে আল্লাহ এতক্ষণ আমাদের রক্ষা করেছেন, তাঁর রহমত সীমাহীন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা হারিও না।
মাছ দুটি খুব পিচ্ছিল ছিল। বারবার হাত ফসকে যাচ্ছিল। বিরক্ত হয়ে রাখালের মা বললেন,
একটু ছাই এনে নিই, তাহলে আর হাত ফসকাবে না।
তিনি ঘরের ভেতরে চলে গেলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ চিরে নেমে এলো এক ক্ষুধার্ত চিল। বিদ্যুতের গতিতে থাবা মেরে মাছ দুটিকে তুলে নিয়ে উড়ে গেল।
আকাশে উড়তে উড়তে স্ত্রী মাছটি আবার কেঁদে উঠল,
এবার তো আর কোনো উপায় নেই। মানুষের হাত থেকে বাঁচলেও চিলের পেটেই শেষ হতে হবে!”
স্বামী মাছটি মৃদু হেসে বলল,
আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের কল্পনারও বাইরে। ধৈর্য ধরো।
চিলটি নদীর ধারের এক বিশাল গাছের দিকে উড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ আরেকটি চিল মাছ দুটি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য আক্রমণ করল। শুরু হলো তীব্র লড়াই। দুই চিলের থাবা আর ডানার আঘাতে একসময় মাছ দুটি ছিটকে পড়ল।
নিচে ছিল বিস্তীর্ণ, গভীর এক নদী।
ঝপাং করে নদীর পানিতে পড়তেই তারা মুক্তি পেল। প্রাণ ফিরে পেল। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে তারা বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
স্ত্রী মাছটির চোখে তখন আনন্দাশ্রু।
আমি বুঝতে পারিনি। যাকে আমি একের পর এক বিপদ ভেবেছিলাম, তার প্রতিটিই ছিল মুক্তির সিঁড়ি।
স্বামী মাছটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না।
মানুষের চোখে যা বিপদ, আল্লাহ চাইলে সেটাই মুক্তির পথ হয়ে যায়।”
দুজনেই মহান রবের শুকরিয়া আদায় করল। বিশাল নদীর বুকে তারা আবার নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।
গল্পের শিক্ষা
জীবনের প্রতিটি বিপদই শেষ নয়।
অনেক সময় যে ঘটনাকে আমরা ধ্বংস মনে করি, আল্লাহ সেটিকেই মুক্তির উসিলা বানিয়ে দেন। তাই হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করতে হবে, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর ওপর অটল ভরসা রাখতে হবে।
,,সমাপ্ত,,
লেখক: মোঃ নাসির উদ্দিন
গলাচিপা, পটুয়াখালী।


















