হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যায়ের পরিণতি: সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একদিন স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিয়তির নীরব কিন্তু অনিবার্য বিচার – কলমেঃ মোঃ নুর ইসলাম মৃধা
- আপডেট সময় : ০৮:২৭:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬ ১২৪ বার পড়া হয়েছে

লেখক: মোঃ নুর ইসলাম মৃধা
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, পটুয়াখালী জজকোর্ট, পটুয়াখালী।
জীবনের দীর্ঘ পথচলায় আমরা নানা ধরনের মানুষের সংস্পর্শে আসি। কেউ আমাদের সাফল্যে আনন্দিত হয়, অনুপ্রেরণা দেয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায়। আবার কেউ অকারণে হিংসা করে, ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, অপবাদ দেয়, সম্মানহানির চেষ্টা করে কিংবা আমাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার জন্য নানাভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা চালায়। তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—অন্যায়কারীরা কি কখনো তাদের কর্মের ফল ভোগ করে? বাস্তবতা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময় সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়।
প্রচলিত একটি কথায় বলা হয়, “দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর পিছন ফিরে দেখবেন, আপনার ক্ষতি আর হিংসা করা মানুষগুলো কেউ সুখে নেই। এটা অভিশাপ নয়, নিয়তির বিচার।” এই কথার গভীরে রয়েছে জীবনের এক চিরন্তন সত্য। এটি কারও প্রতি অভিশাপ নয়, প্রতিশোধের আহ্বানও নয়; বরং মানুষের কর্মফল, বিবেক এবং সময়ের স্বাভাবিক পরিণতির একটি বাস্তব প্রতিফলন।
হিংসা এমন একটি মানসিক ব্যাধি, যা প্রথমে অন্যের ক্ষতি করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনকেই বিষাক্ত করে তোলে। একজন হিংসুক মানুষ কখনো অন্যের সুখ, সাফল্য বা সম্মান সহ্য করতে পারে না। সে সবসময় অন্যকে নিচে নামানোর চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। ফলে নিজের উন্নতির জন্য যে সময় ও শ্রম ব্যয় করার কথা, তা নষ্ট হয় ষড়যন্ত্র, সমালোচনা ও বিদ্বেষে। এই কারণেই হিংসুক মানুষের জীবনে প্রকৃত সুখ ও মানসিক শান্তি খুব কমই দেখা যায়।
অন্যদিকে যে মানুষটি অন্যায়ের শিকার হয়, তার জীবনের সময়টা হয়তো কঠিন হয়ে ওঠে। অনেক সময় মিথ্যা অভিযোগ, অপবাদ, সামাজিক অপমান কিংবা আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। তখন মনে হতে পারে সত্যের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সত্য নিজেই নিজের পরিচয় তুলে ধরে। মানুষ বাস্তবতা বুঝতে শেখে, মিথ্যার মুখোশ খুলে যায় এবং অন্যায়ের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গড়া সাময়িক সাফল্য ভেঙে পড়তে শুরু করে।
ইতিহাসের প্রতিটি যুগই প্রমাণ করেছে—অন্যায় ও জুলুমের আয়ু কখনো দীর্ঘ হয় না। যারা ক্ষমতার অহংকারে মানুষকে কষ্ট দিয়েছে, যারা প্রতারণা করে সম্মান অর্জনের চেষ্টা করেছে কিংবা নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছে, তারা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের কাঠগড়ায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। কারণ সময়ের আদালতে কোনো প্রভাব, ক্ষমতা বা অর্থের জোর চলে না।
আমাদের সমাজেও প্রায়ই দেখা যায়, একজন পরিশ্রমী ও সৎ মানুষকে পেছনে টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়। অফিসে, ব্যবসায়, রাজনীতিতে, এমনকি আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও ঈর্ষা ও বিদ্বেষের কারণে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ঘটে। কিন্তু এসব অন্যায় চিরস্থায়ী হয় না। কারণ সততা, পরিশ্রম ও ন্যায়বোধের শক্তি অনেক গভীর। সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও সত্য একসময় নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও হিংসা ও অন্যায়কে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মানুষকে ধৈর্য, ন্যায়, সততা এবং ক্ষমাশীলতার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অন্যের ক্ষতি করে নিজের উন্নতি কখনো স্থায়ী হয় না। অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্মান, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা একসময় হারিয়ে যায়। কিন্তু সৎভাবে অর্জিত সম্মান মানুষের মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে হিংসা ও বিদ্বেষের প্রকাশ আরও সহজ হয়ে গেছে। কারও সাফল্য দেখলেই অপপ্রচার, কটূক্তি, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা চরিত্রহননের চেষ্টা করা যেন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ এসব কাজ শুধু ভুক্তভোগীকেই কষ্ট দেয় না; বরং সমাজে অবিশ্বাস, বিভক্তি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের পরিবেশ তৈরি করে।
জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ হলো নিজের উন্নতি। যারা আপনাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ না করে নিজের চরিত্র, জ্ঞান, কর্ম এবং সততার মাধ্যমে সফল হওয়াই সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব। কারণ সফলতা কখনো উচ্চস্বরে কথা বলে না; সফলতার ফলই মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় উত্তর হয়ে দাঁড়ায়।
তাই যদি কখনো অন্যায়ের শিকার হন, মনে রাখবেন—প্রতিটি অন্যায়ের তাৎক্ষণিক বিচার নাও হতে পারে, কিন্তু কর্মফল থেকে কেউ মুক্ত নয়। সময় কখনো তাড়াহুড়া করে না, তবে সময় কখনো ভুলও করে না। যে অন্যের জন্য গর্ত খোঁড়ে, অনেক সময় সেই গর্তেই নিজেকে পড়তে হয়। আর যে অন্যায়ের মধ্যেও ধৈর্য, সততা ও ন্যায়ের পথ আঁকড়ে ধরে, শেষ পর্যন্ত সম্মান, মর্যাদা ও মানুষের ভালোবাসা তার কাছেই ফিরে আসে।
নিয়তির বিচার মানে অলৌকিক কোনো প্রতিশোধ নয়; নিয়তির বিচার হলো মানুষের কর্ম, চরিত্র, বিবেক এবং সময়ের সম্মিলিত রায়। তাই অন্যের পতন কামনা নয়, নিজের সততা ও মানবিকতাকে শক্তিশালী করাই হোক জীবনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।










