কারবালা: আপসের বিরুদ্ধে সত্যের চূড়ান্ত ঘোষণা – লেখক: মোঃ নুর ইসলাম মৃধা
- আপডেট সময় : ০৪:১৮:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬ ৭৩ বার পড়া হয়েছে

লেখক: মোঃ নুর ইসলাম মৃধা
কলামিস্ট ও লেখক।
“ইসলাম জিন্দা হয়, হার কারবালা কে বাদ।”
অর্থাৎ, প্রতিটি কারবালার পর ইসলাম নতুন শক্তি, নতুন চেতনা ও নতুন জীবন লাভ করে। এই কথাটি শুধু একটি আবেগঘন উক্তি নয়; এটি ইতিহাসের এক নির্মম কিন্তু অবিসংবাদিত সত্য। কারণ, ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যখনই জুলুম, স্বৈরাচার ও বাতিল শক্তি দ্বীনকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে, তখনই কারবালার আত্মত্যাগ ইসলামের প্রকৃত রূপকে পুনর্জীবিত করেছে।
কারবালা কোনো সাধারণ যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল হক ও বাতিলের চূড়ান্ত মুকাবিলা। একদিকে ছিল ক্ষমতার অহংকার, অন্যদিকে ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার অটল ঈমান। একদিকে ছিল সিংহাসন, অন্যদিকে ছিল শাহাদাত। একদিকে ছিল জুলুম, অন্যদিকে ছিল সত্যের অবিচল পতাকা।
হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) যদি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতেন, তাহলে হয়তো তাঁর জীবন রক্ষা পেত। কিন্তু ইতিহাস জানে, তিনি জীবনকে নয়—দ্বীনকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছেন, সত্যের প্রশ্নে আপস করা ঈমানের কাজ নয়। একজন মুমিন মাথা নত করেন একমাত্র আল্লাহর সামনে; কোনো জালিম শাসকের সামনে নয়।
আজও পৃথিবীতে ইয়াজিদের রূপ বদলেছে, কিন্তু তার চরিত্র বদলায়নি। আজও মিথ্যাকে সত্য বানানোর চেষ্টা হয়, অন্যায়কে ন্যায় বলে প্রচার করা হয়, ক্ষমতার দম্ভে দুর্বলদের অধিকার হরণ করা হয়। যারা জুলুমকে সমর্থন করে, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকে কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে সত্যকে বিকিয়ে দেয়—তারা ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কিছুই গ্রহণ করেনি।
কারবালার শিক্ষা স্পষ্ট—জালিমের সামনে নীরব থাকা নিরপেক্ষতা নয়; বরং জুলুমকে শক্তিশালী করা। সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে সাহস লাগে, ত্যাগ লাগে, ঈমান লাগে। আর সেই সাহসের সর্বোচ্চ প্রতীক হলেন ইমাম হুসাইন (রা.)।
আজ আমরা আশুরা পালন করি, শোক প্রকাশ করি, আলোচনা করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি কারবালার শিক্ষা গ্রহণ করছি? আমাদের চরিত্রে কি সত্যবাদিতা এসেছে? আমরা কি অন্যায়, দুর্নীতি, ঘুষ, মিথ্যা, অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছি? নাকি শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ থেকে কারবালার প্রকৃত চেতনাকে বিস্মৃত করছি?
কারবালা আমাদের শিখিয়েছে, সংখ্যা নয়, আদর্শই বিজয়ী হয়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য চিরস্থায়ী। তরবারি মানুষকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু আদর্শকে কখনো হত্যা করতে পারে না। তাই ইতিহাসে ইয়াজিদের নাম ঘৃণার প্রতীক, আর ইমাম হুসাইন (রা.)-এর নাম সম্মান, মর্যাদা ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
যেখানে সত্যের জন্য ত্যাগ আছে, সেখানেই কারবালার শিক্ষা জীবন্ত। যেখানে জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আছে, সেখানেই হুসাইনের চেতনা জাগ্রত। আর যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগ আছে, সেখানেই কারবালার প্রকৃত বিজয়।
আসুন, আমরা শুধু আশুরার দিন শোক প্রকাশ না করে, কারবালার শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করি। মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সততা, অবিচারের বিরুদ্ধে ন্যায় এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান গ্রহণ করি। তাহলেই কারবালার শিক্ষা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে সত্য, ন্যায় ও ঈমানের পথে অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।


















