অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে সোসাইটি
- আপডেট সময় : ১১:০১:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
অডিট আপত্তিকে দুর্নীতির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে সোসাইটি। সংগঠনটি বলেছে, অডিট আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে আপত্তি নিষ্পত্তি ও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দুর্নীতিবাজ বা অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
আজ সোমবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে এসব কথা বলা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রশাসনিক সুশাসন এবং জনস্বার্থের পক্ষে তারা অবস্থান করছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অনিয়ম ও সরকারি অর্থের অপচয়ের বিরুদ্ধেও সংগঠনটির অবস্থান রয়েছে।
সংগঠনটির ভাষ্য, ‘অভিযোগ, অডিট আপত্তি এবং প্রমাণিত অপরাধ—একটি বিষয় নয়।’ অডিট আপত্তি উঠলে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই, প্রয়োজন হলে তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে নিষ্পত্তির আগেই কোনো অডিট আপত্তিকে দুর্নীতির চূড়ান্ত রায় হিসেবে সংবাদে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
নথি যাচাই করে অনুসন্ধানের আহ্বান
কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকেরা অনুসন্ধান করলে সেটিকে স্বাগত জানানোর কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে সোসাইটি। তবে অনুসন্ধান যেন শুধু একটি অডিট আপত্তি বা একটি প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর না করে, সে আহ্বানও জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে সাংবাদিকদের প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়, সংশোধিত ব্যয় ও প্রকৃত ব্যয় যাচাই করার অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান যাচাইয়ের নথি, বিল ভেটিংয়ের প্রক্রিয়া এবং অর্থ ছাড়ের অনুমোদনসংক্রান্ত নথিও দেখার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের যে দাবি সামনে এসেছে, সেই হিসাবের ভিত্তি জনগণের সামনে পরিষ্কার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির প্রশ্ন, চুক্তিমূল্য, সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় ও প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্যকে সরাসরি ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করা হলে তা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন।
দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা আলাদাভাবে দেখার আহ্বান
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একটি বড় রাষ্ট্রীয় প্রকল্প সাধারণত একজন ব্যক্তি একা পরিচালনা করেন না। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের বিভিন্ন সময়ে একাধিক কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাই কোন সময়ে কোন কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, সে সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত ও তাঁদের ভূমিকা আলাদাভাবে অনুসন্ধান করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
কে কাজের পরিমাণ যাচাই করেছেন, কে গুণগত মান প্রত্যয়ন করেছেন, কে বিল ভেটিং করেছেন, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং কোন নথির ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখার কথা বলা হয়েছে বিবৃতিতে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সোসাইটি বলেছে, শুধু একজন ব্যক্তিকে সামনে রেখে পুরো প্রকল্পের দায় নির্ধারণ করা সঠিক হবে না। তবে এর অর্থ কাউকে দায়মুক্তি দেওয়াও নয়।
দোষী হলে ব্যবস্থা, নির্দোষ হলে অপপ্রচার বন্ধ’
বর্তমান মহাপরিচালকের প্রসঙ্গেও একই অবস্থানের কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে অডিট আপত্তি, অভিযোগ বা সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত ও নিষ্পত্তির আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার বিষয় থাকে না,এর প্রভাব প্রশাসনিক সংস্কৃতির ওপরও পড়ে।
সংগঠনটির মতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ভুল হলে তা যাচাই করতে হবে। ভুল প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে প্রশাসনিক মতবিরোধ বা সিদ্ধান্তগত পার্থক্যকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার আহ্বান
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে কাউকে দুর্নীতিবাজ বা অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করার অনুরোধ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এমন প্রশাসনিক সংস্কৃতি কাম্য নয়, যেখানে কোনো কর্মকর্তা অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে নিজের পদ নিয়ে অনিরাপত্তায় ভোগেন। ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা ঠিকাদার, সিন্ডিকেট বা স্বার্থগোষ্ঠীর সম্পত্তি নয় উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে জনগণের সম্পদ, রাষ্ট্রের সম্পদ।
সাংবাদিকদের প্রতি সংগঠনটির শেষ আহ্বান কোনো একটি পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ, সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অপপ্রচার নয়, প্রমাণ চাই; অভিযোগ নয়, তদন্ত চাই। দুর্নীতি হলে শাস্তি চাই, আর নির্দোষ হলে ন্যায়বিচার চাই।


















